সাম্প্রতিক সাহিত্য

বাঙালির ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের মৌলিক রূপান্তরে হাঁটছে লোকন

lukun image

গত ৯ ডিসেম্বর সোমবার পূর্ব লন্ডনের হ্যানবারি স্ট্রিটের মন্টিফিউরি সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল সাহিত্যের ছোট কাগজ লোকন এর পাঠ প্রকাশ অনুষ্ঠান । লোকন সম্পাদক কবি ওয়ালি মাহমুদ- এর সভাপতিত্বে  অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক, কলামিষ্ট আবদুল গাফফার চৌধুরী।  প্রাণবন্ত অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন-লোকনের সহ-সম্পাদক কবি ইকবাল হোসেন বুলবুল। অনুষ্ঠানে লোকনের তিনটি সংখ্যার পাঠ আলোচনায় অংশ নেন বিলেতের বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিকরা।

প্রধান অতিথি বিশিষ্ট লেখক আবদুল গাফফার চৌধুরী বলেন, লোকন শব্দ এর অর্থ আমার জানা নেই। সম্পাদককে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি বললেন-অবলোকন থেকেই নাকি লোকন নামকরণ করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ অনেক নতুন শব্দ তৈরী করেছেন। সাহিত্য শুধু সাহিত্য চর্চা নয়, সাহিত্য নির্মাণ করার বিষয়ও। আমি নিয়মিত অনেক ইংরেজ কবিতা পড়ি, তারা নতুন শব্দ তৈরী করে বটে কিন্তু অতীত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় না। অতীত এবং বতর্মানের একটা যোগসূত্র বেঁধে রাখে তারা। আমাদের বর্তমান সময়ে অনেকের কবিতা আমি পড়ি কিন্তু সত্যি বলতে কি বুঝে উঠতে পারিনা। নতুন শব্দ তৈরী করলেই শুধু হয় না. তা বোধগম্যও হতে হবে, সুপাঠ্য হতে হবে। কবি নজরুল ইসলাম  অনেক কবিতা  লিখেছেন শুধু ফার্সি শব্দ দিয়ে, মাঝখানে মাত্র দুটি কিংবা একটি বাংলা শব্দ আছে, তারপরও তার কবিতা উৎরে গেছে। দুর্বোধ্যতা কখনও সরস সাহিত্য হতে পারে না। আবার ভাষাকে চর্চার মাধ্যমে আধুনিকও করা যায়, যেমনটি লোকনে প্রকাশিত আবদুর রউফ, আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম, দিলওয়ার এর মৌলিক লেখায় আমরা খুঁজে পাই।

লোকন প্রথম সংখ্যার পাঠ আলোচনায় কবি,লেখক শামীম আজাদ বলেন, লোকন সাহিত্যের অনেকগুলো কাগজের মধ্যে আমার কাছে অন্যতম। এর যথেষ্ট কারণও আছে। লোকন একটা লক্ষ্য নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে। দেখলে মনে হবে টাউস সাইজের, কিন্তু এর প্রতিটি পর্বে, ক্রমবিন্যাসে  বাঙালির মৌলিক দিক-ভাষা, মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস ও ঐতিহ্য  নিয়েই লোকনের পথচলা। সম্পাদক তার দায়িত্বে দূরপ্রসারী মুন্সিয়ানার ছাপ রেখেছেন। দুই সম্পাদক ওয়ালী মাহমুদ ও ইকবাল হোসেন বুলবুলকে অনেক ধন্যবাদ পাঠকদের একটি ভালো মানের লিটলম্যাগ উপহার দেবার জন্য।

দ্বিতীয় সংখ্যার পাঠ আলোচনায় সাংবাদিক, কলামিস্ট ফারুক যোশী বলেন লোকন এবং সাহিত্য অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। দ্বিতীয় সংখ্যায় কবিতাই প্রাধান্য পেয়েছে। তবে সংখ্যায় কবিতা বেশী হলেও সম্পাদক কবিতার সৃজন ও মৌলিকমান বজায় রেখেই তা প্রকাশ করেছেন। কবিতায় দহন আছে, দ্রোহ-বিদ্রোহ আছে, প্রেম- বিরহ  ইত্যাদি আছে। তিনি লোকনে প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য কয়েকটি কবিতা অনুষ্ঠানে উপস্থিত দর্শকদের পাঠ বর্ণনায় তুলে ধরেন। লোকন দ্বিতীয় সংখ্যায় প্রয়াত কথাসাহিত্যিক আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম এর নয়া দুনিয়া প্রকাশিত হয়েছে। ইতিহাস বলে-পঞ্চাশ এর দশক একটা ইতিহাস নির্ভর সময়। সে সময়ের পটভূমি নিয়ে লেখক আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম এর নয়া দুনিয়া আমাদের একটা নয়া দুনিয়ার স্বপ্ন দেখিয়েছিল। যা বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। গুণী এই লেখক আজীবন সংগ্রামী, সামাজিক বৈষম্য আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে রাজনীতির মাঠে ও সাংবাদিকতায় সোচ্চার ছিলেন। লোকন এর অগ্রযাত্রায় এইরকম সাহসী ও তৃণমূলের কলম যোদ্ধাদের পাঠকদের মাঝে তুলে ধরার প্রয়াস অব্যাহত রাখার আহবান জানান।

লোকন তৃতীয় সংখ্যা নিয়ে আলোচনা করেন কবি ফারুক আহমেদ রনি। তিনি বলেন,  লোকন ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ হচ্ছে এটা খুব খুশির খবর। প্রতিটি সংখ্যায় অনেক সরস লেখা রয়েছে, এমনকি পান্ডুলিপিও স্থান পেয়েছে। তিনি লোকনের আগামী সংখ্যাগুলোতে বিলেতের কবি, সাহিত্যিক, লেখক, গবেষকদের লেখাগুলোকে প্রাধান্য দেবার আহবান জানান। তৃতীয় বাংলায় অনেকেই আছেন যারা বাংলা সাহিত্যকে লব্ধ করে যাচ্ছেন দিন দিন। আমাদের একজন আবদুল গাফফার চৌধুরী, মাসুদ আহমেদ, শামীম আজাদ, ফারুক যোশী এরকম অনেক আছেন । তাদের লেখা দেশ বিদেশে সমান মূল্যায়িত এবং পাঠক সমাদৃত। লোকন বিলেতের কবি লেখকদের মধ্যে সাহিত্যের সেতুবন্ধন হিসাবেই কাজ করবে বলে আমি আশা করি।

অনুষ্ঠানে পাঠ প্রতিক্রিয়া বক্তব্যে লেখক, গবেষক ড.মুুকিদ চৌধুরী: যখন কোন মৌলিক কাজ প্রকাশ হয়ে থাকে  আমি তখন দেখি তার নিরীক্ষণ। আমি দেখি তার বিষয় বৈচিত্র, লেখকের সৃজনশক্তি ইত্যাদি। লোকনের সব সংখ্যা আমি পড়েছি এবং আমি সম্পাদকের চিন্তাশৈলী দেখে লোকনের ভবিষ্যত নিয়ে অনেক আশার আলো দেখি। কথা সাহিত্যিক আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম, লেখক আব্দুর রউফ,কবি দিলওয়ার নিয়ে আলোচনাগুলো যেকোন শিকড় সন্ধানী লেখকদের জন্য অনন্য পাওয়া। লোকন পাঠে সাহিত্যের রস,স্পৃহা এবং মুগ্ধতা পাওয়া যায়।

লেখক ও গবেষক ফারুক আহমেদ বলেন, লোকনের প্রবন্ধগুলো আমার কাছে অনেক মূল্যবান। আমি লেখালেখির অনেক রসদ পেয়েছি। সম্পাদকের দায়িত্বশীল সম্পাদনা লোকন পাঠকের মাঝে স্থান করে নিয়েছে যৌক্তিক কারণেই।

অনুষ্ঠানে পাঠ প্রতিক্রিয়া বক্তব্যে লেখক হামিদ মোহাম্মদ বলেন, সাহিত্যের ইতিহাসে জানা যায় বিশ্বের প্রতিষ্ঠিত সব লেখকই লেখালেখি শুরু করেন সাহিত্যের কাগজ এর মাধ্যমে। ১৮৪০ সালে ছোট কাগজের প্রচলন শুরু হওয়া মৌলিক শিল্পটি আজ সাহিত্যের অপরিহার্য অংশ। বিলেতে অনেকগুলো সংবাদপত্র থাকলেও সবগুলো মূলত সংবাদের পেছনে কাজ করছে,সাহিত্যের পেছনে নয়। অথচ সাহিত্যই আসল। বিলেতের সংবাদপত্রগুলোতে মৌলিক কাজের আমাদের সুযোগ খুব সীমিত। যা খুবই দূ:খজনক।

গোলাম কবির বলেন. লোকন আগে আমি দেখিনি। এই প্রথম দেখলাম এবং লোকনে লেখার আগ্রহ প্রকাশ করছি। আমি কবি ফারুক আহমেদ রনির বক্তব্যের সাথে একমত, বিলেতের ছোট কাগজগুলোকে বিলেতের লেখকদের লেখা প্রকাশে প্রাধান্য দেয়া দরকার।

গল্পকার সাঈম চৌধুরী বলেন, লোকন দেখতে টাউস সাইজের। তবে লোকনকে টাউস সাইজ দিয়ে বিবেচনায় নিলে চলবে না। লোকনকে দেখতে হবে তার মৌলিক লেখা দিয়ে।  এখন প্রযুক্তির যুগে মনে হয় সবাই সম্পাদক। পাঠক নেই! না দেখে, না বুঝে সাহিত্যের কথা হয়না। আলোচনা হতে হবে পাঠ করে, জেনে-বুঝে। আমরা লোকন নিয়ে বিশিষ্টজনদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুনলাম। সম্পাদকদ্বয় আমাদের সবার পরিচিত এবং প্রিয়, তাদের প্রতি আমাদের অভিবাদন ও অনেক শুভকামনা। সাথে একটি অনুরোধ, লোকনের পরবর্তী সংখ্যার পাঠ আলোচনার অন্তত একমাস পূর্বে আলোচকদের হাতে যেন বইটি পৌছে দেয়া হয়। তাহলে পাঠ আলোচনা  করতে, শুনতে এবং এর স্বাদ উপভোগ করা যায়। আমাদের জন্য ভালো হয়।

কবি মিল্টন রহমান বলেন, লোকনের প্রথম সংখ্যা থেকে আমি পরিচিত। একটা নারী যেমন সাজে তেমনি সম্পাদক লোকনকে সাজিয়েছেন। প্রতিটি সংখ্যাতে নির্বাচিত লেখা প্রকাশ পেয়েছে এবং সংখ্যাগুলোতে বিষয়বৈচিত্র পাঠকদের মুগ্ধ করেছে নি:সন্দেহে।

পাঠ আলোচনা অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করেন কবি মুজিবুল হক মনি, কবি আবু মকসুদ, কবি আনোয়ারুল ইসলাম অভি।

প্রখ্যাত সাহিত্যিক আকাদ্দস সিরাজুল ইসলাম এবং আব্দুর রউফ চৌধুরী’র কবিতা আবৃত্তি করেন বিশিষ্ট আবৃত্তিকার মুনিরা পারভীন। অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ইসহাক কাজল, কবি আতাউর রহমান মিলাদ,  কবি কাজল রশীদ,  কবি নজরুল ইসলাম, গীতিকার ও সংগঠক নেছওয়ার মাহমুদ, কবি তুহীন চৌধুরী,  কবি উদয় শংকর দুর্জয়,  কবি মোজাহিদ খান, কবি ফয়জুল ইসলাম, সাংবাদিক মুহাম্মদ জুবায়ের, আবৃত্তিকার শহিদুল ইসলাম সাগর, উপস্থাপক মিসবাহ জামাল, সংগঠক সরওয়ার আহমদ, লুৎফুর রহমান, সিরাজ উদ্দিন হোসেন, কামাল হোসেন, কামাল উদ্দিন, আমিনুল ইসলাম, বাবুল হোসেন, শাহেদ আহমদ, আব্দুল কাইয়ুম, শাহজাহান বাবু, ছরওয়ার হোসেন খান, হাফিজ আহমদ  সহ আরো অনেকে।


সংহতি সাহিত্য আড্ডা

মৌলিক ও সৃজন মনস্ক চিন্তা চেতনার বোধে জেগে থাকা বিকেল

NEWS PAPER

– আনোয়ারুল ইসলাম অভি

ষোল সেপ্টেম্বর সোমবার পূর্বলন্ডনের মন্টিফিউরি সেন্টারে সংহতি সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে সাহিত্য আড্ডার নিমন্ত্রণ দিয়ে, সবাইকে বিনীত অনুরোধ করা হয়েছিল- যথাসময়ে উপস্থিত হবার জন্যে।অর্থাৎ আড্ডা শুরু হবে বিকাল ৬:০০টায় এবং চলবে  সন্ধ্যা ৯:০০টা পর্যন্ত। মোঠফোনে প্রায় সবাই আশ্বস্থও করে ছিলেন আড্ডার স¦ার্থে সবাই ঠিক সময়ে উপস্থিত হবেন। বাঙালীদের চিরচেনা অভ্যাস থেকে খোদ বিলেতেও আমরা  বের হতে পারিনি! নটার ট্রেন কটায় ছাড়ে ? অভিধাটি আমাদের সাথে লেগেই রইল।মনে হয়, যেখানেই বাঙালী; সেখানেই আমাদের  সময়জ্ঞান প্রবাদটি উচ্চারিত হবে! সত্যি বলতে কি, সংহতির আড্ডায় আমরা বসেছিলাম সন্ধ্যে সাতটা বেজে দশ মিনিটে!

বিলেতের কবি, ছড়াকার,লেখক,সাংবাদিক ও সাহিত্য অনুরাগীদের সাথে আড্ডায় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট উদ্ভিদবিজ্ঞানী,পরিবেশবিদ,অনুবাদক ও লেখক দ্বিজেন শর্মা এবং  কানাডা  থেকে আগত অন্যতম কবি, লেখক আব্দুল হাসিব।  সংহতি সাহিত্য পরিষদের সভাপতি কবি ইকবাল হোসেন বুলবুলের স্বাগত বক্তব্যে আড্ডা শুরু।

আড্ডার সঞ্চালক  সংহতি সাহিত্য পরিষদের সাহিত্য সম্পাদক কবি আনোয়ারুল ইসলাম অভি  প্রাককথনে বিনম্রে জানিয়ে দেন-সঞ্চালকের হাতে আড্ডার নাটাই থাকলেও আড্ডায় আলোচনায় রাখতে পারি-  একজন লেখকের লেখক হয়ে উঠার নেপথ্যের গল্প,কবি-লেখক এর বোধের জায়গা গুলো, বাংলা সাহিত্যের অনুবাদ,মৌলিক লেখালেখি ও লেখকের বেড়ে উঠার সময়,পরিবেশ ও  পাঠকের কাছে লেখা গুলো পৌছে যাবার ও দেবার বিষয় এবং লেখক-পাঠকের মৌলিক বন্ধুত্বা ইত্যাদি প্রসঙ্গ।

বলে রাখি, আমরা আড্ডায় বসে ছিলাম চতুর্ভূজ আকারে। যেন সবাই, একে অন্যকে সহজে দেখতে পাই এবং তর্কে- বিতর্কে থাকি আড্ডার সুন্দর আবহে! সংগঠনের সভাপতির স্বাগত বক্তব্যের মাধম্যে বলা যায় আমরা শব্দবাজরা আড্ডাবাজ হয়ে ডুব দেই আড্ডায়…….

কেন লিখি?

কবি আব্দুল হাসিব শুরু করেন-আমার কাছে বিষয়টি বহুমাত্রিক।জীবন খেয়ায় ভাসতে ভাসতে বোধের সিন্ধুকে অনেক জমা হয়েছে।তা প্রকাশের অন্যরকম স্পিহা থেকে লিখি,মা হারানোর বেদনা,জীবনের টানাপোড়ন, প্রেম হয়নি বলে, আবার প্রেমে পড়ে মনের তাড়না থেকে লিখি।

লেখক দ্বিজেন শর্মা: ২২ বছর রাশিয়ায় ছিলাম। লেখক জীবনের অনেক উত্থান-পতন কাহিনী আছে।তখন সবাই বলতো রাশিয়ার সাহিত্য। ২০০২ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির প্রধান হয়ে কাজ করেছি। সবখানেই আমার  প্রধান কাজ  হলো লেখালেখি। জানি লিখছি, মনের তাগিদে,সৃষ্টির উন্মাদনার তাড়নায়,আবার বলা যায় জীবিকার তাগিদেও লিখে যাচ্ছি।

কবি আবু মকসুদ: আমি লেখক দ্বিজেন শর্মার কাছে জানতে চাচ্ছি- লেখকের ভেতরচোখ তীক্ষœ,অনুভূতিপ্রবন হওয়া খুব জরুরী আমরা সবাই স্বীকার করিও।রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্রে আমরা যে প্রকৃতিকে দেখি এখন আমরা সেভাবে দেখিনা।এর  হতাশার দিকটি কি?

লেখক দ্বিজেন শর্মা: হ্যা, হতাশার বিষয় তো বটেই।আমাদের চিন্তা ও সৃজনের জায়গায় দৈন্যতা আছে। আমরা সেই চোখে দেখার ক্ষমতা রাখিনা। এটা আমাদেরই ব্যর্থতা!

প্রসঙ্গ অনুবাদ সাহিত্য:

কবি ফারুক আহমেদ রনি: -কবিতা অনুবাদ শক্ত বিষয়। একজন কবির বোধের জায়গা গুলো অথবা অনুভূতি আরেকজনের অনুবাদে কি সত্যিকার ভাবার্থ আসে? আর অনুবাদক যদি কবি জ্ঞানের বাইরের কেউ হন!

লেখক দ্বিজেন শর্মা: আমি রনির সাথে একমত পোষণ করছি। কবিতা বিষয়ক জ্ঞান না থাকলে কবিতা অনুবাদ খুবই কঠিন কাজ।

কবি আবু মকসুদ: কবিতার অনুবাদ বুদ্ধদেব বসুর পর বলা যায় সেই মানের আর হয়নি। যে গুলো হচ্ছে খুব হালকা মনে হয়।

দ্বিজেন শর্মা: বাংলাদেশে সৈয়দ সামসুল হক করেছেন।তার অনুবাদ ভালো।

কবি ইকবাল হোসেন বুলবুল: বাংলাদেশের সাহিত্য গুলো বিশ্বমানের। কিন্তু আমাদের সাহিত্য গুলো অনুবাদ সে তুলনায় তো হচ্ছেনা।

দ্বিজেন শর্মা: হ্যা, সে তুলনায় হচ্ছেনা। অনুবাদ করলেই সব সাহিত্য অনুবাদের মানদন্ডে যায়না। কবিতা ও সাহিত্য দুটো বিষয়েই দখল থাকতে হয়।তাহলে গ্যাপ থাকেনা।শব্দের ধ্বনিগত একটা সমস্যা আছে।

কবি ফারুক আহমেদ রনি: আমার মতে কবিতা তার নিজস্ব ভাষায় থাকা উচিত।

কবি লিপি হালদার: তাহলে তো  অন্যরা রবীন্দ্রনাথ পেতনা। নোবেল পুরস্কারও জুটতোনা।

কবি ফারুক আহমেদ রনি: সেটা তো রবীন্দ্রনাথ নিজে করেছেন।

কবি লিপি হালদার : রনি ভাই, আপনি কি  লষ্ট ইন ট্রান্সলেশন-কে বুজাতে চাচ্ছেন?

কবি সাগুপ্তা চৌধুরী: এখানে আমি একটু যোগ করতে চাই- অনুবাদ হওয়ার জন্য মৌলিক ও ভালোমানের সাহিত্য যেমন অন্যতম বিষয় তেমনি অনুবাদের পর লেখকের মৌলিক সাহিত্য ও চিন্তা চেতনার স্বরুপটি থাকলে অনুবাদ অবশ্যই অনবদ্যের দাবী রাখে।

কবি আহমদ ময়েজ: পাভলে নেরুদার অনুবাদ যেটি আমরা পড়ি, সেটাতো আমাদের ছিলনা!

ছড়াকার রেজুয়ান মারুফ: তবে একটা বিষয় সত্য যে, গ্লোবাল সাহিত্যকে জানতে হলে অনুবাদ এর বিকল্প নেই।

ফারুক আহমেদ রনি: সৈয়দ সামসুল হক যখন কবিতা অনুবাদ করেন তখন আমরা কিছু একটা পাবো। মৌলিক কাজের অনুবাদ সহজ নয়,আমি সেটাই বলতে চাইছি।

লেখক আব্দুল কাদির মুরাদ: একজন লেখক যখন তার লেখার মৌলিক রুপদেন,অভিব্যক্তি প্রকাশ করেন- সেটা তার নিজস্বরুপ,অন্যজন লেখকের অনুভূতি গুলো  কিভাবে প্রকাশ করবেন? অনুবাদে লেখার মৌলিকত্বের স্বরুপ নির্ণয়ে একটা অমিল থাকবে সেটাকে অস্বীকারের সুযোগ নেই।

কবি লিপি হালদার: বাংলাদেশে সাহিত্যে  অনেক ভালো কাজ হয়েছে এবং হচ্ছে।বিলেতেও বাংলা সাহিত্যচর্চা অনেক ভালো অবস্থানে আছে।অনুবাদের ক্ষেত্রে সংহতি সাহিত্য পরিষদ ভূমিকা নিতে পারে।সেটা আমাদের জন্য খুব ভালো দিক হবে বলে আমি মনে করি।

কবি আনোয়ারুল ইসলাম অভি: আমরা অনুবাদ প্রসঙ্গ আজকের জন্য মুলতবি করতে চাই,আপনারা জানেন – আমাদের সময়ের সীমাবদ্ধ আছে। দাদা(দ্বিজেন শর্মা) কি কিছু যোগ করবেন?

দ্বিজেন শর্মা: দীর্ঘ বাইশ বছরে রাশিয়ায় বসে  অনুবাদের কাজে নিয়োজিত ছিলাম। দেশে এসে কয়েক বছর এশিয়াটিক সোসাইটিতে কাজ করেছি। অনুবাদ একটি ব্যয় বহুল কাজ। এর জন্য প্রচুর টাকার প্রয়োজন।সরকারী উদ্যোগে এই কাজটি হওয়া দরকার।যেটা বাংলাদেশে হচ্ছেনা। বলা হয়ে থাকে বাংলা একাডেমি কাজ করছে। কিন্তু আমরা সবাই জানি ও সংশ্লিস্টরা স্বীকার করেন যে- এই ক্ষেত্রটি খুবই সীামত।।ভারতে অন্য ভাষায় অনেক অনুবাদ হয়।আমরা এই সব কাজে বরাবর পিছিয়ে রই।

আবু মকসুদ: আমাদের বাঙলা সাহিত্য কি বিশ্বমানের না?

দ্বিজেন শর্মা: অবশ্যই বিশ্বমানের লেখক বাংলাদেশে আছেন।আখতারুজ্জামান ইলিয়াস,আল মাহমুদ,নির্মলেন্দুগুণ,শামসুর রহমান,জীবনানন্দ দাশ, (দূ:খিত এই মূহুর্তে সবার নাম মনে পড়ছেনা, এই বয়েস হলে যা হয়!) আমি মনে করি, তাদের সাহিত্য অবশ্যই  বিশ্বমানের।

আরেকটি বিষয় আমাদের ভূলে গেলে চলবেনা- আমরা জাতি হিসাবে বিরাট বিভ্রান্তির মধ্যে ছিলাম-পাকিস্তান, ইসলামী মূল্যবোধ,ভাষা, রাজনীতি ইত্যাদির মাঝে এতো সংক্রমিত,সংক্ষুদ্ধ ছিলাম। এই সব আমাদের এখনও বিভ্রত করে।এটা আমাদের অনেক দূর্বল করে রেখেছে।

আমাদের শিশুসাহিত্য:

সঞ্চালক আনোয়ারুল ইসলাম অভি- দ্বিজেন শর্মাকে প্রশ্ন করেন, আপনি লেখালেখি প্রসঙ্গে প্রায় একটি কথা জোরদেন -সাহিত্যে বোধের জায়গা ও যোগ্যতাকে। জাতি হিসাবে আমরা এখনও বিভ্রান্তির মাঝে আছি বলা চলে।আমাদের মনস্তত্বে নাড়া দিতে শিশুসাহিত্য বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে। আমাদের শিশুসাহিত্য কোথায় আছে?

দ্বিজেন শর্মা: সাহিত্য চর্চায় অবশ্যই বোধের ক্ষমতা লাগে আর শিশুসাহিত্য তো আরো বেশী অনুভূতিপ্রবণ।নিজে দুএকটা লিখেছি,সে গুলোকে আমি ভালো মানের মনে করিনা। আমাদের রবীন্দ্রনাথ খুব ভালো করে দেখিয়ে দিয়েছেন কিভাবে শিশুসাহিত্য লিখতে হয়।

আব্দুল হাসিব: একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধের স্মৃতি নামে স্মৃতিচারণমূলক একটি বই আছে আমার। আমার অভিজ্ঞতায় বলতে পারি শিশুসাহিত্য অনেক কঠিন একটা জায়গা। প্রখর অনুভূতি ও মানবিক চিন্তাশৈলী শক্তি নি:সন্দেহে খুব প্রয়োজন।

কবি গোলাম কবির: আমাদের প্রজন্মের হাতে  শিশুসাহিত্যকে যে ভাবে তুলে ধরা দরকার ছিল সেটা আমরা করতে পারিনি।বরং আমরা শিশুদের বাণিজ্যকরণ করেছি।টিভি খুললেই দেখা যায় শিশুতোষ নানা প্রতিযোগিতা। বাস্তবে শিশুতোষ মান কতটা বজায় রাখা হচ্ছে তার খেয়াল রাখার মনে হয় কেউ নেই।ছয় বছরের শিশু গানের প্রতিযোগিতায় এসে গাণ করে- ও আমার রসিয়া বন্ধুরে,তুমি কেন কোমরের বিছা হইলানা….!

কবি আহমদ ময়েজ: আমাদের শিশুসাহিত্য যে এগুচ্ছেনা তা ঢালাও ভাবে বলা ঠিক না। যে ভাবে এগুতে পারতো, সেভাবে হয়তো এগুয়নি! আমরা জাতিগত ভাবে দুুটি মনস্তত চিন্তায় বড় হয়েছি বলেই আমরা এরকম হীনমন্যতায় ভূগি। শিশুর জন্য মনস্থাস্তিক চিন্তা থাকা দরকার এবং এক্ষেত্রে লেখকের ভূমিকা অপরিসীম।

প্রচারে লেখক না পাঠকেই লেখক?

লিপি হালদার মন্তব্য করেন- আমাদের মাঝে অনেক প্রতিবান লেখক আছেন যারা অর্থাভাবে তাদের বই প্রকাশ করতে পারছেননা। তাদেরকে পাঠক সমাজে তুলে আনতে সাহিত্য সংগঠন গুলোর ভূমিকা থাকা দরকার বলে মনে করি।

দ্বিজেন শর্মা: হ্যা, আমাদের ছড়িয়ে ছিটিয়ে অনেক প্রতিভা আছে।একটা সময়ছিল লেখকের জন্য সুযোগের অভাব ছিল।এখন আর সেই অবস্থা নেই।প্রতিভা থাকলে যে কেই তার মৌলিক কাজ বিভিন্ন ভাবে পাঠকের সামনে তুলে ধরতে পারেন।

আবু মকসুদ: আমি একটু দ্বিমত পোষণ করছি- অবহেলিত লেখক বলে কিছু আমি এই জমানায় বিশ্বাস করিনা।লেখককে অতিমূল্যায়িত করাও ঠিক নয়।বর্তমান আকাশ সংস্কৃতির যুগে পত্রিকা,ছোটকাগজ এর পাশাপাশি  ফেইস বুক,টুইটার,ব্লগ,ই-পত্রিকা ইত্যাদি অনেক গুলো মাধ্যম আছে ;পাঠ ইচ্ছে করলে তার লেখা প্রকাশ করতে পারেন খুব সহজেই।

সাগুপ্তা চৌধুরী: এজন্যে কি বলবেন-কবিতার মূল্যায়ন দরকার নেই?

আবু মকসুদ: জ্বিনা, আমি বলছি,একজন লেখককে অতিমূল্যায়িত করার দরকার নেই।লেখকের মৌলিক কর্ম পাঠক ঠিকই মূল্যায়ন করে।

আড্ডার দ্বিতীয় পর্বে ছিল কবিতা আবৃত্তি ও স্বরচিত কবিতাপাঠ। কবি সাগুপ্তা চৌধুরী আবৃত্তি করেন-  পাভলো নেরুদার কবিতা, কবি তুহীন চৌধুরীর কবিতা আবৃত্তি করেন ছড়াকার ও আবৃত্তিশিল্পী রেজুয়ান মারুফ।স্বরচিত কবিতাপাঠ করেন মুজিবুল হক মনি, কবি ময়নুর রহমান বাবুল, কবি আবু মকসুদ, কবি আহমেদ ময়েজ,কবি ইকবাল হোসেন বুলবুল, কবি সাইফুদ্দিন আহমদ বাবর ,কবি এম মোসাহিদ খাঁন ,কবি আবীর ইসলাম, কবি উদয় শংকর দুর্জয়,কবি শাহ আলম, কবি আরাফাত তামিম, কবি নজরুল ইসলাম, কবি আব্দুল মুহিত,লেখক মোজাহিদ চৌধুরী,ছড়াকার রেজুয়ান মারুফ।

মেঘলা দিনে চা ,ঝালমুড়ি, জিলাপি ইত্যাদি খেয়ে আড্ডাকে প্রাণবন্ত রাখেন- নাঠ্যকর্মী রুহুল আমীন, কবি আফজল হোসেন আদিতœ, রুনা হাসিব, পুথিঁপাঠক মাসুদুর রহমান,শিল্পী পাগলা জাবেদ, সাংবাদিক আব্দুল কাদির মুরাদ, কবি সাগুপÍা চৌধুরী, কবি সাগর রহমান,কবি লিপি হালদার,গীতিকার সামছুল জাকি স্বপন,কবি আব্দুল মুহিত,লেখক মোজাহিদ চৌধুরী, রাজনৈতিক কাউন্সিলার শহিদ আলী, সংগঠক আব্দুল মতলিব,সাংবাদিক জাহেদী ক্যারল,সাংবাদিক তাইসির মাহমুদ,সাংবাদিক মুনজের আহমদ চৌধুরী,নারগিছ আলী,তারেক হোসেন,জাকির হোসেন প্রমূখ।

আমাদের সৃজন জানালা গুলো:

আড্ডার প্রায় শেষ অংশে, সঞ্চালক  জানিয়ে রাখেন -এখন থেকে সংহতি প্রতি মাসে এরকম সৃজন আড্ডার আয়োজন করবে।সংহতি তাদের নিজস্ব ওয়েব পেজ এ সবাইকে সাহিত্য বিষয়ক লেখালেখির আমন্ত্রণ জানান।

লেখক ফারুক আহমদ: সাহিত্য আড্ডা আমাদের জন্য খুব ভালো উদ্যোগ।আমাদের মৌলিক চিন্তা চেতনার স্ফোরণ ও সুকুমার জায়গা গুলো সমৃদ্ধ করতে নিয়মিত আড্ডা হলে আমাদের জন্য খুব ভালো হয়।সংহতিকে অনেক ধন্যবাদ।

আনোয়ারুল ইসলাম অভি: বিলেত এখন বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার উর্বর ভূমি সন্দেহ নেই।একজন লেখক ইচ্ছে করলেই তার লেখা প্রকাশের ক্ষেত্রটি পেতে পারেন। এখানকার লেখকরা নিয়মিত লিখছেনও।দিনে দিনে লেখক- পাঠকের সংখ্যা  উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। কবি লেখক ফারুক আহমেদ রনি সম্পাদিত আমাদের বাংলা ব্লগ  ইতিমধ্যে সৃজনশীল লেখকদের সরব উপস্থিতি লেখক-পাঠকের মধ্যে সেতু বন্দন তৈরী করতে পেরেছে।বিলেত থেকে অনেক গুলো ছোট কাগজ প্রকাশিত হয়- আতাউর রহমান মিলাদ ও আবু মকসুদ সম্পাদিত শব্দপাঠ,আহমদ ময়েজ সম্পাদিত ভূমিজ, ওয়ালী মাহমুদ ও ইকবাল হোসেন বুলবুল সম্পাদিত লোকন,কাজল রশীদ সম্পাদিত মনুস্বর, ফারুক যোশী ও আনোয়ারুল ইসলাম অভি সম্পাদিত বৈভব, উদয় শংকর দুর্জয় সম্পাদিত  স্পন্দন ইত্যাদি। সংহতি সাহিত্য পরিষদ তাদের নিজস্ব ওয়েব সাইট নিয়মিত আপডেট করছে এবং লেখকদের নিয়মিত লেখার আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।এছাড়াও সংহতি সাহিত্য পরিষদ দুই হাজার চৌদ্দ সালে প্রতিষ্ঠার পঁচিশ বছরে রজত জয়ন্তী পালন করবে বিধায় সে বছর কবিতা উৎসবটি আরো উৎসব মূখর ভাবে পালন করার প্রস্তুতি গ্রহন করছে। উৎসবপ্রেমী সকললের সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে।

হল কর্তৃপক্ষের তাগাদায় আমরা যখন উঠি, ঘড়ির কাটা নটা পার হয়ে গেছে অনেক আগে! আড্ডার অমলিন স্মৃতি অনন্তসময় ধরে রাখার সুযোগ নিয়ে, বলতে গেলে আমরা সবাই হাসি মুখে তৃপ্তির w¯œগ্ধতায় দাড়াই ডিজিটাল ক্যামেরার সামনে।তারপর, আরেকটি আড্ডার অপেক্ষা নিয়ে , হীমেল বাতাস গায়ে মেখে সবাই চলি যার যার নিজস্ব গন্তব্যে।চোখে ভাসে বর্ণমালার মূখ, স্মৃতিমাখা মেঘলাবিকেল,কবিতার পংক্তিমালা….

জয়তু সংহতি সাহিত্য আড্ডা।

 

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s